একটি সফল বিপ্লব বা গণ-অভ্যুত্থান কখনো ধূমকেতুর মতো আলো ছড়ায় না। এটি মূলত সুপ্ত আগ্নেয়গিরি থেকে দীর্ঘদিনের জমে থাকা ক্ষোভ ও লাভার বহিঃপ্রকাশ।
কোনো দেশের গণজাগরণ কেবল একটি দেয়াশলাইয়ের কাঠি নয়, বরং দীর্ঘ বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রজ্বলিত অগ্নিমশাল।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ যেমন কেবল ৯ মাসের সশস্ত্র সংগ্রাম ছিল না, বরং ১৯৪৭ থেকে শুরু করে ৫২-এর ভাষা আন্দোলন, ৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং ৭০-এর নির্বাচনের ধারাবাহিক ফসল; ঠিক তেমনি ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবও কেবল ৩৬ দিনের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ফ্রেমে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বিগত ১৭ বছরের বৈষম্য, দুর্নীতি, লুটপাট এবং ভোটাধিকার হরণের বিরুদ্ধে জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভের চূড়ান্ত বিস্ফোরণ।
বিগত ১৭ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে রাজপথে যে জনমত ও গণ-অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল, তারই যৌক্তিক পরিণতি ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পটপরিবর্তন।
এই সুদীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের সূচনা করেছিলেন বেগম খালেদা জিয়া এবং এর কৌশলগত চূড়ান্ত রূপরেখা প্রণয়ন করেছিলেন তারেক রহমান।
বিএনপির দীর্ঘদিনের কাঠামোগত আন্দোলন তৃণমূল পর্যায়ে যে বার্তা পৌঁছে দিয়েছিল, তা-ই পরবর্তী সময়ে ছাত্র-জনতার ক্ষোভের সঙ্গে মিশে এক বিশাল গণজোয়ারে রূপ নেয়।
জুলাই আন্দোলনের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বুঝতে হলে ২০০১ সাল পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। ২০০১ সালের অক্টোবর নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট এক অভূতপূর্ব বিজয় লাভ করে। স্বনির্ভর অর্থনীতি, স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি এবং জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে দেশ পরিচালনার এক নতুন যুগ শুরু হয়। তবে দেশের এই অগ্রযাত্রা ব্যাহত করতে দেশীয় সুশীল সমাজের একটি অংশ, নির্দিষ্ট কিছু গণমাধ্যম এবং আন্তর্জাতিক কুশীলবরা একযোগে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। যার চূড়ান্ত রূপ ছিল ২০০৭ সালের ১/১১-এর অসাংবিধানিক ও বিতর্কিত ক্ষমতার হস্তান্তর।
২০০৭ সালের মইনউদ্দিন-ফখরুদ্দীনের ছদ্মবেশী সেনা শাসনের প্রধান লক্ষ্যই ছিল রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে দুর্বল করা। বিশেষ করে বিএনপিকে নেতৃত্বশূন্য করা। এই সময়ে বেগম খালেদা জিয়া, তার বড় ছেলে তারেক রহমান এবং ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোকে কারারুদ্ধ করা হয়। রিমান্ডের নামে তারেক রহমানের ওপর যে বর্বরোচিত শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়, তা ছিল নজিরবিহীন।
মূলত তৎকালীন ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সেই নির্মম দমনপীড়নের মধ্য দিয়েই ২০২৪ সালের স্বৈরাচার বিরোধী গণ-অভ্যুত্থানের মনস্তাত্ত্বিক বীজ রোপিত হয়েছিল।
২০০৮ সালের একটি বিশেষায়িত নির্বাচনের মাধ্যমে পুনরায় ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু করে। জনগণের ভোটাধিকার স্থায়ীভাবে কেড়ে নিতে সংবিধানে থাকা নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করা হয়। ২০১৪ সালে ভোটারবিহীন ও একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের গণতন্ত্রের কফিন তৈরির চেষ্টা করা হলে, বেগম খালেদা জিয়ার দূরদর্শী নেতৃত্বে দেশের মানুষ একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে অভূতপূর্ব জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেয়।
পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসামূলক মিথ্যা মামলায় সাজা দিয়ে বেগম খালেদা জিয়াকে বছরের পর বছর কারাবন্দী ও অন্তরিন রাখা হয়। প্রবীণ এই নেত্রীর ওপর রাষ্ট্রীয় নিষ্ঠুরতা দেশের সাধারণ মানুষের বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দেয়। দলের এই চরম সংকটের মুহূর্তে হাল ধরেন তারেক রহমান। সুদূর প্রবাসে থেকেও তিনি আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহারে দলকে নতুন করে পুনর্গঠিত করেন এবং সর্বদলীয় জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়ে আন্দোলনের মহাসড়ক তৈরি করেন।
২০১৮ সালের 'রাতের ভোট' ছিল দেশের ইতিহাসে নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর সবচেয়ে বড় আঘাত। এই নির্বাচনে অংশ নিয়ে তারেক রহমান অত্যন্ত বিচক্ষণ কৌশলে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে তৎকালীন সরকারের স্বৈরাচারী ও গণবিরোধী চরিত্র উন্মোচন করেন। তাঁর এই দূরদর্শী রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতার ফলেই বিশ্ব সম্প্রদায় বুঝতে পারে যে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের নামে কী ধরনের প্রহসন চলছে। এটি পরবর্তী সময়ে জুলাই বিপ্লবের পক্ষে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠনে বড় ভূমিকা রাখে।
দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে বিএনপির নেতা-কর্মীদের যে পরিমাণ ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছে, তা সমসাময়িক রাজনৈতিক ইতিহাসে বিরল। দলটির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ৪২ হাজার ৮২৫টিরও বেশি রাজনৈতিক মামলা দায়ের করা হয়, যেখানে আসামির সংখ্যা ছিল ৫০ লাখ ৩২ হাজার ৬৫৫ জনেরও বেশি। হাজার হাজার নেতাকর্মী পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন, গুমের শিকার হয়েছেন এবং অর্থনৈতিকভাবে নিঃস্ব হয়েছেন। এই দীর্ঘ সময়ে দলটির ১ হাজার ৫৫১ জন নেতাকর্মী প্রাণ হারিয়েছেন এবং ৪২৩ জন গুমের শিকার হয়েছেন। এই অবর্ণনীয় দমনপীড়নের মধ্যেও তারেক রহমানের সুদৃঢ় ও আপসহীন নেতৃত্বের কারণে দলটি ভেঙে যায়নি, বরং আরও শক্তিশালী হয়ে মাঠে টিকে ছিল।
২০২৪ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলন যখন বৈষম্যবিরোধী গণ-আন্দোলনে রূপ নেয়, তখন বিএনপির দীর্ঘ ১৭ বছরের এক দফা আন্দোলনের লিগ্যাসি এর সঙ্গে যুক্ত হয়। তারেক রহমানের স্পষ্ট রাজনৈতিক নির্দেশনায় বিএনপির সর্বস্তরের নেতাকর্মী নিজেদের জীবন বাজি রেখে সাধারণ ছাত্র-জনতার পাশে দাঁড়ায়, তাদের সর্বাত্মক সহযোগিতা দেয় এবং রাজপথের ফ্রন্টলাইনে থেকে বুলেট ও টিয়ারশেল মোকাবেলা করে। ২০২৪ সালের এই চূড়ান্ত গণ-অভ্যুত্থানেও বিএনপির ৪২২ জন নেতাকর্মী শহীদ হন। মূলত ছাত্র-জনতার বীরত্ব এবং বিএনপির দীর্ঘ আন্দোলনের এই যৌথ শক্তিই ৫ আগস্টের রাজনৈতিক মুক্তি ও স্বৈরাচারের পতন নিশ্চিত করে।
৯ ঘন্টা আগে বৃহস্পতিবার, জুন ১১, ২০২৬