Daily Bangladesh Mirror

ঢাকা, শুক্রবার, জুন ১২, ২০২৬, ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

সারাদেশ

রাষ্ট্রীয় সম্পদ হরিলুটে সিনিয়র সহকারী সচিবের ম্যাজিক

নিজস্ব প্রতিবেদক:
১ দিন আগে শুক্রবার, জুন ১২, ২০২৬
# ফাইল ফটো




রাষ্ট্রায়াত্ত বিভিন্ন কল-কারখানা, মিল-ফ্যাক্টরি ব্যবহার শেষে তা ভাঙ্গারি (স্ক্র্যাপ) আকারে বিক্রি করে সরকার। শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা এসব সম্পদ বিক্রীর কাজ দেখভাল করে মন্ত্রনালয়ের যে বিভাগ, সেই রাষ্ট্রায়াত্ত কর্পোরেশন অনুবিভাগে কর্মরত আছেন সিনিয়র সহকারী সচিব মানিক উদ্দিন।  


দুর্নীতির দায়ে দীর্ঘদিন ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) থাকার পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় অর্থের বিনিময়ে প্রমোশন নিয়ে শিল্প মন্ত্রণালয়ে পোস্টিং নেন তিনি। 


এরপর থেকেই অবৈধ টাকা উপার্জনে বেপোরোয়া হয়ে উঠেছেন মানিক উদ্দিন। রাষ্ট্রের সম্পদ নামমাত্র মূল্যে বিক্রী করে অবৈধ 

অর্থ উপার্জনে তৎপর তিনি। ডেইলি বাংলাদেশ মিররের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে মানিক উদ্দিনের অপকর্মের নানা ফিরিস্তি। সেসব নিয়ে দুই পর্বের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সিরিজ সাজিয়েছে ডেইলি বাংলাদেশ মিরর। 


অনৈতিকভাবে আর্থিক সুবিধা পাবার জন্য নিয়ম ভেঙ্গে এবং দুর্নীতির আশ্রয় নিয়ে রাষ্ট্রায়াত্ত বিভিন্ন কল-কারখানা, মিল-ফ্যাক্টরি স্ক্র্যাপ আকারে বিক্রির জন্য অভিনব পন্থা অবলম্বন করছেন মানিক উদ্দিন। দুর্নীতির দায়ে দীর্ঘদিন ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রনালয়ে সংযুক্ত ছিলেন তিনি। গত ৫ জানুয়ারী ২০২৫ এ পদোন্নতি নিয়ে শিল্প মন্ত্রনালয়ে যুক্ত হন মানিক উদ্দিন। সিনিয়র সহকারী সচিব পদে বর্তমানে শিল্প মন্ত্রণালয়ের বিএসএফআইসি (BSFIC) শাখায় দায়িত্ব পালন করছেন মানিক। এ দায়িত্ব পেয়েই নতুন করে দুর্নীতিতে জড়িয়েছেন তিনি। রাষ্ট্রীয় সম্পদ, নানা মিল-ফ্যাক্টরির যন্ত্রাংশ নামমাত্র মূল্যে বিক্রী করে হাতিয়ে নিচ্ছেন শত কোটি টাকা। 


ডেইলি বাংলাদেশ মিররের অনুসন্ধানে জানা যায়, মানিক উদ্দিন তার মন্ত্রনালয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগের সিনিয়র এবং জুনিয়র কর্মকর্তা এবং কর্মচারীদের সঙ্গে নিয়ে গড়ে তুলেছেন একটি বড় নেটওয়ার্ক। এই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে তিনি তার পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দিয়ে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নেন। রাষ্ট্রের যেসব কল-কারখানা মেয়াদ উত্তীর্ণ হয় সেগুলো মানিকের টার্গেটে পরিনত হয়। পরে সেসব কারখানা তার নেটওয়ার্কের কর্মকর্তাদের ব্যবহার করে স্ক্র্যাপ হিসেবে বিক্রীর অনুমতি নেন মানিক। একই সঙ্গে মানিকের আছে একাধিক ঠিকাদারের সঙ্গে সখ্যতা। তাদের সঙ্গে কাজ পাইয়ে দেয়ার চুক্তি করেন মানিক উদ্দিন। এসব রাষ্ট্রীয় সম্পদ বিক্রীর জন্য ওটিএম বা উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করার নিয়ম থাকলেও মানিক তার নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে ডিপিএম বা সরাসরি বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেন। ডিপিএম প্রক্রীয়ায় সম্পদ বিক্রী করলে শুধুমাত্র নির্দিষ্ট একজন ঠিকাদারকে কাজ দেয়া যায়। তবে এই ডিপিএম প্রক্রীয়া স্বচ্ছতার জন্য সরকারের নিয়ম অনুযায়ী রাষ্ট্রের অনুমোদিত অন্য আরেকটি প্রতিষ্ঠান মধ্যস্থতা করে। এখানেও আছে মানিকে জাদু। তিনি সেসব মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদেরও নিজের করে নেন মোটা অংকের টাকা দিয়ে, যেন তার পছন্দের ঠিকাদারের কাজ পেতে কোন বাধা না থাকে।

এরপর পছন্দের ঠিকাদারের সঙ্গে তার চুক্তি হয় কাজ পাইয়ে দেয়ার বিষয়ে। এসময় ঠিকাদাররা তাকে অগ্রিম টাকা পরিশোধ করে। অগ্রিম টাকা নিয়ে মানিক মধ্যস্থতাকারী কোন একটি সংস্থাকে কারখানা বিক্রীর প্রক্রীয়ার সঙ্গে যুক্ত করে। এভাবে কাজ পাইয়ে দেয়ার বিনিময়ে কোটি কোটি টাকার কমিশন নেন মানিক উদ্দিন।

শুধু তাই নয় আরো ভয়ংকর তথ্য হল, তিনি শুধু কাজ পাইয়ে দিতে ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নেন না। টাকা পেলে ঠিকাদারের চাহিদা মত সম্পদের মূল্য কম দেখিয়ে তালিকা তৈরি করেন যেন এগুলো বাজারে বিক্রী করে ঠিকাদার অধিক মুনাফা করতে পারে। একই সঙ্গে কারখানার সম্পদ এবং যন্ত্রাংশের তালিকা তৈরির সময় অধিকাংশ যন্ত্রাংশ তালিকায় রাখা হয়না, সেসব যন্ত্রাংশ আলাদাভাবে ওই ঠিকাদারের কাছে বিক্রী করে বাড়তি টাকা পান মানিক। 

এখানেই শেষ নয়, ঠিকাদারদের নিয়ন্ত্রণ করতে মানিক উদ্দিনের মন্ত্রণালয়ের বাইরেও আছে আলাদা সিন্ডিকেট। তারা মানিকের হয়ে ঠিকাদারদের সঙ্গে দরদাম এবং অর্থের লেনদেন করে। এছাড়া চাহিদামত মূল্য নির্ধারনে মানিকের নির্দেশে ওই সিন্ডিকেটের সদস্যরা ঠিকাদারের সরকারি কল কারখানা আগাম পরিদর্শনে নিয়ে যায়। সেখানে একমাত্র সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের যাতায়াতের নিয়ম থাকলেও তার কোন তোয়াক্কা না করেই বাইরের লোকদের অবাধে যাতায়াতের ব্যবস্থা করেন মানিক উদ্দিন, যেন ঠিকাদার মালামাল দেখে তার পছন্দ মত দাম নির্ধারণ করতে পারে। 

ডেইলি বাংলাদেশ মিররের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, সম্প্রতি তার এসব কর্মকান্ড অন্য বিভাগের সহকর্মীদের নজরে এলে সাম্প্রতিক নিলামে উঠতে যাওয়া সকল কারখানার ডিপিএম নিলাম ব্যবস্থা বাতিল করে নতুনভাবে ওটিএম বা উন্মুক্ত দরপত্র আহ্বান করেছে শিল্প মন্ত্রণালয়। এর মধ্যে রয়েছে চট্টগ্রাম কেমিক্যাল কোম্পানি এবং খুলনার খালিশপুরের হার্ডবোর্ড কারখানা। এখন তিনি নতুন কৌশল হিসেবে পছন্দের ঠিকাদারদের সর্বোচ্চ দর জানিয়ে দিয়ে কাজ পাইয়ে দিতে তৎপর রয়েছেন। 


এর বাইরেও ঘোড়াশাল সার কারখানা, ফেণীর পাওয়ার প্ল্যান্টসহ অন্তত ৬টি রাষ্ট্রায়াত্ত প্রতিষ্ঠান ঘিরে তার অপতৎপরতা চলমান রয়েছে। এসব দুর্নীতির বিষয় বক্তব্য জানতে মানিক উদ্দিনকে একাধিকবার ফোন করে এবং ম্যাসেজ পাঠালেও কোন সাড়া মেলেনি।


ডেইলি বাংলাদেশ মিররের নিবিড় অনুসন্ধানে উঠে এসেছে মানিক উদ্দিনের সিন্ডিকেটের সকল সদস্যের নাম। মন্ত্রনালয়ের একাধিক যুগ্ম সচিব তার এমন অনৈতিক কর্মকান্ডের সঙ্গে জড়িত। সেই সঙ্গে জড়িত ঠিকাদারদের পরিচয় এবং আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও নিশ্চিত হবার পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের বাইরের সিন্ডিকেট সদস্যদের নাম পরিচয় জেনেছে ডেইলি বাংলাদেশ মিরর। প্রতিবেদনের পরের পর্বে তাদের পরিচয়সহ বিস্তারিত তুলে ধরবে ডেইলি বাংলাদেশ মিরর।

১ দিন আগে শুক্রবার, জুন ১২, ২০২৬

ইউটিউব সাবস্ক্রাইব করুন