সেনাবাহিনীতে কর্মরত অবস্থায় তিন দফায় দীর্ঘ দিন কুয়েতে প্রেষণে নিযুক্ত ছিলাম। ডুবুরি রোগ বিশেষজ্ঞ হিসেবে কাজ করার সুবাদে সে দেশের নৌবাহিনীর ডুবুরি এবং স্পেশাল ফোর্সের সাথে কাজ করেছি। পারস্য উপসাগরে অবস্থিত কুয়েতের নয়টি দ্বীপ এবং সমুদ্রে অবস্থিত কুয়েতের বহু সংখ্যক তেলের রিগের নিরাপত্তা ও রুটিন তদারকি করা ছিল আমাদের টিমের যৌথ দায়িত্ব। সে হিসেবে কুয়েত, প্রতিবেশী ইরাক ও সমুদ্র
সীমান্তবর্তী ইরানের গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ ও স্থাপনা সম্পর্কে কমবেশি অবহিত থাকার চেষ্টা করেছি। আমার “কুয়েত ও কায়া কথা” বইটিতে কুয়েতের নয়টি দ্বীপ সম্মন্ধে বিস্তারিত তুলে ধরার চেষ্টা করেছি ।সম্প্রতি সংঘটিত যুক্তরাষ্ট্র- ইসরাইল- ইরানের মধ্যকার যুদ্ধের সম্পৃক্ততায় সম্প্রতি ইরানের অন্যতম খার্গ দ্বীপটি শিরোনামে এসেছে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরান নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালীতে আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে সব দেশের পণ্যবাহী জাহাজের জন্য উন্মুক্ত করে না দিলে ইরান অধ্যূ্ষতি খার্গ দ্বীপে সামরিক হামলার হুমকি দিয়েছে। কিন্তু কেন? আসুন জানি দ্বীপটি সম্পর্কে কিছু তথ্য ।
খার্গ দ্বীপ পারস্য উপসাগরে অবস্থিত ইরানের একটি ক্ষুদ্র কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপ। একে ইরানের "অর্থনৈতিক হৃৎপিণ্ড" বলা হয়, কারণ দেশটির মোট অপরিশোধিত তেল রপ্তানির প্রায় ৯০ শতাংশই এই দ্বীপের টার্মিনাল দিয়ে সম্পন্ন হয়।পারস্য উপসাগরের হাতেগোনা কয়েকটি দ্বীপের মধ্যে এটি একটি, যেখানে প্রাকৃতিক মিঠা পানির উৎস রয়েছে।যার ফলে এখানে প্রাচীনকাল থেকেই জনবসতি গড়ে উঠেছে। প্রায় ২৫ বর্গ কিমি আয়তনের পাথুরেপ্রবাল দ্বীপটিতে মাত্র নয় হাজারের মত মানুষের বসবাস রয়েছে। খার্গ দ্বীপটি নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিধায় জনসাধারণের জন্য অধিকাংশ সময় চলাচলে নিষেধাজ্ঞা থাকে; তাই দ্বীপটি প্রায়শঃই " নিষিদ্ধ দ্বীপ " হিসাবে পরিচিত।এই দ্বীপে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে, যার মধ্যে সম্ভবত সপ্তম শতাব্দীর একটি খ্রিস্টান মঠের ধ্বংসাবশেষও অন্তর্ভুক্ত। এছাড়াও এখানে সমাধি, মন্দির এবং খ্রিস্টপূর্ব ৫৫০ থেকে ৩৩০ অব্দের মধ্যে নির্মিত শিলালিপি রয়েছে।
খার্গ দ্বীপ বিশ্বের বৃহত্তম অফশোর অপরিশোধিত তেল টার্মিনালগুলোর একটি। এখান থেকে তেল মূলত চীনসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করা হয়। বিশ্লেষকদের মতে, এই দ্বীপের তেল রপ্তানি সুবিধা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ইরানের অর্থনীতি তাৎক্ষণিকভাবে বিপর্যস্ত হতে পারে এবং বিশ্ববাজারে তেলের দামে বড় ধরনের অস্থিরতা তৈরি হতে পারে।
দ্বীপটি ইরানের উপকূল থেকে ২৫ কিলোমিটার (১৬ মাইল) এবং হরমুজ প্রণালী থেকে ৪৮৩ কিলোমিটার (৩০০ মাইল) উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত । সংলগ্ন উপকূলীয় বুশেহর প্রদেশ দ্বারা শাসিত এই দ্বীপটি ইরানের তেলজাত পণ্যের ৯০% পর্যন্ত রপ্তানির পাশাপাশি ৩০ মিলিয়ন ব্যারেল (৫ মিলিয়ন ঘনমিটার) পর্যন্ত তেল সংরক্ষণের সুবিধা রয়েছে। দ্বীপটি ইরানের বেশ কয়েকটি স্থলভাগের তেলক্ষেত্রের কাছাকাছি অবস্থিত; যেখান থেকে খার্গ পর্যন্ত পানির নিচে পাইপলাইন চলে গেছে।খার্গ শহর এবং খার্ক বাতিঘর এই দ্বীপে অবস্থিত। ১৯৬০-এর দশকে এটি একটি প্রধান তেল টার্মিনালে পরিণত হওয়ার আগে, ইরানি লেখক জালাল আল-এ-আহমদ বিখ্যাতভাবে দ্বীপটিকে "পারস্য উপসাগরের অনাথ মুক্তা" বলে অভিহিত করেছিলেন।
দ্বীপটির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক গুরুত্বের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। বহু শতাব্দী ধরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল, যা ষোড়শ থেকে সপ্তদশ শতাব্দীতে পর্তুগিজ সাম্রাজ্য এবং অষ্টাদশ শতাব্দীতে ডাচ ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যের নিয়ন্ত্রণে ছিল।মধ্যযুগে ৯৮২ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে খার্গকে মুক্তার একটি ভালো উৎস হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি ভারত ও দক্ষিণের বন্দর বসরার মধ্যে চলাচলকারী বাণিজ্য জাহাজগুলির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিরতিস্থল হিসেবে কাজ করত । এ সময় এখানে মুক্তা আহরণ ও বাণিজ্যের পাশাপাশি, খার্গের অর্থনীতি ফল এবং খেজুর চাষের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছিল।
পর্তুগিজরা ১৬২২ সাল পর্যন্ত হরমুজ প্রণালীকে একটি বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করত। পারস্য এবং এশিয়ায় স্বার্থযুক্ত অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তিগুলির বিরুদ্ধে প্রণালীটির সামরিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার জন্য খার্গ দ্বীপে তারা পর্তুগিজ দুর্গ নির্মাণ করেছিল। ব্রিটিশরা এক সময় দ্বীপটি অল্প সময়ের জন্য দখল নিয়েছিল।
বিংশ শতাব্দীতে রেজা শাহ পাহলভী খার্গকে রাজনৈতিক বিরোধীদের নির্বাসনের স্থান হিসেবে পুনঃব্যবহার করেন, যা সেখানে ব্যাপক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। ১৯৫৬ সালেপাইপলাইনের মাধ্যমে আনা তেল ধারণ করার জন্য খার্গে তেল জলাধার নির্মাণের কাজ শুরু হয় । এ সময়দ্বীপটির সাথে প্রায় ১৬০ কিমি দীর্ঘ পাইপলাইন স্থাপন করা হয় এবংখার্গ বিশ্বের বৃহত্তম তেল চালান টার্মিনাল হিসাবে বিবেচিত হতে থাকে।
১৯৬০-এর দশকে, ইরান উপসাগরের মহীসোপানে দুই দেশের ভূখণ্ডের বিস্তৃতি নিয়ে সৌদি আরবের সাথে আলোচনায় বসে । তারা একটি সংশোধিত সমদূরত্ব রেখায় সম্মত হয়, যার ফলে খার্গ ইরানের এখতিয়ারভুক্ত হয়। ১৯৬৯ সালে, শাহের শাসনামলে, ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি এবং মার্কিন কোম্পানি অ্যামোকোরঅংশীদারিত্বে দ্বীপটিকে একটি তেল টার্মিনালে পরিণত করা হয় । এভাবে ক্রমান্বয়েখার্গ দ্বীপ বিশ্বের বৃহত্তম অফশোর অপরিশোধিত তেল টার্মিনাল এবং ইরানি তেলের প্রধান সমুদ্র টার্মিনালে পরিণত হয়।
১৯৭৯ সালে, ইরানি বিপ্লবের পর, ন্যাশনাল ইরানিয়ান অয়েল কোম্পানি আমোকোর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে । বিপ্লবের পর থেকে চলমান নিষেধাজ্ঞাসত্ত্বেও, ইরান আত্মনির্ভরশীলতা বিকাশের জন্য এবং অন্যান্য দেশের মাধ্যমে তেল পাঠানো এড়াতে দ্বীপটিতে স্থাপনা নির্মাণ অব্যাহত রেখেছে।
দখল- পুনর্দখলের পাশাপাশি দ্বীপটিতে সামরিক হামলা নতুন নয়। ১৯৮০-এর দশকে ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় দ্বীপটিতে বোমা হামলা চালানো হয়েছিলএবং ১৯৮২ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে ইরাকি বিমান বাহিনীর ভারী বোমাবর্ষণে স্থাপনাগুলো অচল হয়ে পড়ে। বর্তমান সংঘাতের শুরু অর্থাৎ মার্চ মাসেই ইসরায়েল দ্বীপটিতে বোমা হামলার কথা বিবেচনা করছে;অন্যদিকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটি দখল করার পক্ষে ছিল। গত ১৩ মার্চ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা করে যে, সংঘাতের অংশ হিসাবে দ্বীপের সামরিক স্থাপনাগুলিতে বোমা হামলা করা হয়েছে । প্রায় ৯০টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানারপরও দ্বীপের তেল পরিকাঠামো অক্ষত ছিল। ২০ মার্চ ২০২৬ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট মিঃ ডোনাল্ড ট্রাম্প হরমুজ প্রণালী দিয়ে ২ দিনের মধ্যে জাহাজ চলাচল উম্মুক্ত করে না দিলে খার্গ দ্বীপটিতে হামলার ঘোষণা দেয়।
লেখক:
কর্নেল নাজমুল হুদা খান (অব.)
পরিচালক, মেডিক্যাল সার্ভিসেস
বিআরবি হাসপাতাল।
২ ঘন্টা আগে সোমবার, মার্চ ২৩, ২০২৬
