ফুটবলকে বলা হয় ‘দ্য বিউটিফুল গেম’। নব্বই মিনিটের নিরবচ্ছিন্ন লড়াই, গতি, আবেগ ও কৌশলের সমন্বয়ে এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। ২০২৬ সালের ফিফা বিশ্বকাপে ফুটবলপ্রেমীদের আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছে একটি নতুন বিষয়—‘হাইড্রেশন ব্রেক’। ম্যাচের মাঝপথে তিন মিনিটের জন্য খেলা বন্ধ রেখে খেলোয়াড়দের পানি পান ও বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ক্রীড়া চিকিৎসা বিজ্ঞানে একে খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য সুরক্ষার জন্য যুগোপযোগী পদক্ষেপ বলছেন, আবার কেউ একে বাণিজ্যিক স্বার্থ ও সম্প্রচার-সুবিধার কৌশল নামেও অভিহিত করছেন।তবে এটি সত্যি যে, ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক উষ্ণতা এবং খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্যঝুঁকির বাস্তবতায় হাইড্রেশন ব্রেক এখন বিশ্ব ফুটবলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে।
ফুটবলে হাইড্রেশন ব্রেক
ফুটবলে হাইড্রেশন ব্রেকের ধারণা একেবারে নতুন নয়। ২০১৪ সালের ব্রাজিল বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো ফিফা অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ম্যাচ চলাকালে খেলোয়াড়দের পানি পানের জন্য আনুষ্ঠানিক বিরতি দেয়। এরপর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে এবং ২০২২ কাতার বিশ্বকাপেও এটি প্রয়োগ করা হয়।২০২৬ বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর বিভিন্ন শহরে। এর মধ্যে অনেক ভেন্যুতে দিনের বেলায় তাপমাত্রা ৩৫ থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছেছে। ফলে খেলোয়াড়দের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে ফিফা বাধ্যতামূলকভাবে হাইড্রেশন ব্রেক চালু রেখেছে। সাধারণত প্রতি অর্ধে ৩০ মিনিটের কাছাকাছি সময়ে তিন মিনিটের এই বিরতি দেওয়া হয়। এছাড়া ইউরোপের দেশসমূহে ৫-১০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় খেলয়োয়াড়গণ খেলে অভ্যস্থ বিধায় হাইড্রেশন ব্রেক জরুরী হিসেবে অভিহিত করেছেন ক্রীড়া চিকিৎসা বিশেজ্ঞগণ।
ফুটবলে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়া
একজন ফুটবলার ম্যাচ চলাকালে গড়ে ১০ থেকে ১৩ কিলোমিটার পর্যন্ত দৌড়ান। তীব্র গরমে এই শারীরিক পরিশ্রমের ফলে শরীর থেকে ২ – ৩ লিটার পরিমাণ ঘাম বের হয়। ঘামের সঙ্গে বেরিয়ে যায় পানি, সোডিয়াম, পটাশিয়াম ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ ইলেক্ট্রোলাইট।মানবদেহের প্রায় ৬০ শতাংশই পানি। শরীরের ওজনের মাত্র ২ শতাংশ পানি কমে গেলেও মনোযোগ, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং শারীরিক দক্ষতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যেতে পারে। ৩ থেকে ৪ শতাংশ পানি হারালে দেখা দিতে পারে মাথা ঘোরা, পেশিতে খিঁচুনি এবং হিট এক্সহসশন। আর ৫ শতাংশের বেশি পানি হারালে হিট স্ট্রোকের মতো জীবন-হুমকিস্বরূপ অবস্থা সৃষ্টি হতে পারে।হাইড্রেশন ব্রেকের সময় খেলোয়াড়রা শুধু পানি পান করেন না; অনেকেই ইলেক্ট্রোলাইটসমৃদ্ধ পানীয় গ্রহণ করেন, যা শরীরের তরল ও খনিজের ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে সহায়তা করে।
স্বাস্থ্য সুরক্ষায় হাইড্রেশন ব্রেক
ক্রীড়া চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, হাইড্রেশন ব্রেকের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এটি খেলোয়াড়দের তাপজনিত অসুস্থতা থেকে রক্ষা করে।এতেশরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে থাকে, হৃদযন্ত্রের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমে, পেশির খিঁচুনি ও ক্লান্তি হ্রাস পায়, মনোযোগ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা বজায় থাকে এবং চিকিৎসক ও ফিজিওথেরাপিস্টরা খেলোয়াড়দের দ্রুত স্বাস্থ্য মূল্যায়নের সুযোগ পান।বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে হাইড্রেশন ব্রেক শুধু সুবিধা নয়, বরং ক্রীড়াবিদদের জন্য একটি প্রয়োজনীয় সুরক্ষাব্যবস্থা।
হাইড্রেশন ব্রেক বিতর্ক
হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে আপত্তিও কম নয়। অনেক সাবেক ফুটবলার ও বিশ্লেষকের মতে, ফুটবলের মূল আকর্ষণ এর নিরবচ্ছিন্ন গতি। মাঝখানে তিন মিনিটের বিরতি খেলার স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করে।কোচরা এই বিরতিকে অনেক সময় অতিরিক্ত ‘টাইম আউট’ হিসেবে ব্যবহার করেন। খেলোয়াড়দের নতুন নির্দেশনা দেওয়া, কৌশল পরিবর্তন করা কিংবা ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি হয়। ফলে কেউ কেউ এটিকে ফুটবলের ঐতিহ্যবিরোধী বলেও মনে করেন।এ বিরতির সময়ে সম্প্রচারকারী প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত বিজ্ঞাপন প্রচারের সুযোগ পায়। ফলে স্বাস্থ্যসুরক্ষার পাশাপাশি বাণিজ্যিক স্বার্থও এখানে কাজ করছে কি না, সে প্রশ্ন উঠেছে।
দর্শকদের প্রতিক্রিয়া
২০২৬ বিশ্বকাপের কয়েকটি ম্যাচে হাইড্রেশন ব্রেকের সময় স্টেডিয়ামে দর্শকদের অসন্তোষও দেখা গেছে। বিশেষ করে উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে খেলা থেমে যাওয়ায় অনেক দর্শক বিরক্তি প্রকাশ করেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হচ্ছে।তবে সচেতন দর্শক, ক্রীড়া চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞ মনে করেন, দর্শকের বিনোদনের চেয়ে খেলোয়াড়দের জীবন ও স্বাস্থ্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। থাকলেই খেলার মান বজায় রাখতে খেলোয়াড়দের সুস্থতা প্রধান।
বৈশ্বিক উষ্ণতায় হাইড্রেশন ব্রেকের বাস্তবতা
বিজ্ঞানীরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ক্রীড়াজগতেও বড় প্রভাব ফেলবে। বর্তমানে বিশ্বের অনেক অঞ্চলে তাপপ্রবাহের ঘটনা বাড়ছে। ফলে ফুটবল, ক্রিকেট, টেনিস কিংবা ম্যারাথনের মতো খেলায় হিট-রিলেটেড ঝুঁকি ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে।এই বাস্তবতায় হাইড্রেশন ব্রেককে অনেকেই ভবিষ্যতের ক্রীড়া ব্যবস্থাপনার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখছেন। হয়তো আগামী দিনে আরও উন্নত তাপমাত্রা-ভিত্তিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা নীতিমালা চালু হবে।
বিশ্বকাপ ফুটবল ২০২৬-এর হাইড্রেশন ব্রেক নিয়ে বিতর্ক থাকলেও এর পেছনে রয়েছে সুস্পষ্ট বৈজ্ঞানিক ও জনস্বাস্থ্যগত ভিত্তি। খেলোয়াড়দের শরীর থেকে হারিয়ে যাওয়া পানি ও ইলেক্ট্রোলাইট পূরণ, তাপজনিত অসুস্থতা প্রতিরোধ এবং সর্বোচ্চ কর্মক্ষমতা বজায় রাখার জন্য এ বিরতি কার্যকর ভূমিকা পালন করছে।ফুটবলের ঐতিহ্য ও আধুনিক ক্রীড়া চিকিৎসার মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে নেয়ার এ প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে ভবিষ্যতের খেলাধুলার নতুন দিকনির্দেশনা। খেলোয়াড়দের স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই খেলার সৌন্দর্য টিকে রাখার মূলচাবিকাঠি।
লেখক-
কর্নেল (অব.) নাজমুলহুদা খান,
এমফিল, এমপিএইচ, ডিএমও, ডিএই (যুক্তরাষ্ট্র)
পরিচালক, মেডিক্যালসার্ভিসেস, বিআরবিহাসপাতাল
৯ ঘন্টা আগে সোমবার, জুন ২২, ২০২৬